ভিনদেশী কন্যা

শীতের দিন, প্রতিদিনের মতোন আজও নিজের সকল কাজগুলো শেষ করিয়া বিছানায় মাথা দিলাম। একটু ঘুমানোর
বৃথা চেষ্টা করিতেছি, বুঝতেই পারিতেছি কিন্তু কিছুতেই চোখে ঘুম মেলাইতে পারিলাম না। মাথায় কিসের যেনো চিন্তা-ভাবনা বারেবার চলিয়া আসিতেছে। হঠাতই মনে পড়িয়া গেলো ভিনদেশী এক কন্যার কথা। যার সাথে আমার কোনোদিনও কোনরকম দেখা হয়েছিলো না।

অনেকদিন আগের কথা, তখন আমাকে চেনার কোনো উপায় ছিলো না। আমি ছিলাম আদিম যুগের একটা ছেলে। ছিলো না কোনো অহংকার, ছিলো না কোনো বিলাশীতা। নিজের কর্ম নিয়া আমি সদাই ব্যস্ত থাকিতাম। শহর থেকে অনেক দূরে নির্জনে থাকিতে খুব পছন্দ করিতাম। তাই তো, আমার খুব পছন্দের একটি জায়গা, হৃদয়পুর। যেখানে আমি বারবার ছুটে যাইতাম। আমি আমার নিজের কোনো প্রশংসা কিংবা বদনাম করিতেছি না। ইহা নেছক জানানোর জন্যেই।

আমি ছিলাম সাদাসিধে একটি মানুষ। কথাই আছে, সাদাসিধে মানুষের আবার মনের মানুষ হয় নাকি? কথাটি সম্পূর্নই মিথ্যা। আমারও মনের মানুষ ছিলো, কিন্তু তাকে কোনোদিন দেখেছিলাম না। শুধুই কল্পনাতে তাকে দেখিতাম। তার সাথে আমার কল্পপ্রেম হয়েছিলো,


প্রেয়সী তোমারে মোর মুক্ত মনো ঘরে,
হৃদয় পিঞ্জরে বন্দি করেছি গোপনে।
পরিয়েছি পুষ্পমাল্য প্রবল যতনে,
তোমার ঐ স্নিগ্ধ গালে ,আর অকাতরে-
ভেসে চলেছি প্রেমের অতল সাগরে।
ফুটন্ত জবার মত শয়নে স্বপনে,
হৃদয়ে হৃদয় জুড়ে কেবলি দুজনে,
চির শান্তির কাননে স্নিগ্ধ হৃদয়পুরে।
মৌন বাসনা লুকায়ে তোমার অজান্তে,
তোমাকে ভালোবাসি হে, রুপশ্রী রমনী।
তাই কল্পনাতে তুমি মিষ্টি হাসি হেসে,
হৃদয়ে হৃদয়ে চিরে প্রতিটি প্রভাতে।
আমার অঙ্গনে আসো সেজেঁ বধুরানী,
বাস্তবে দুজনে মোরা বহুদুরে বসে।


একদিন বিকালে পাড়ার কিছু বন্ধুদের সাথে হাঁটিতে বের হইলাম। নিজ গ্রাম ছেড়ে, বিকালের প্রাকৃতিক অপরূপ দৃশ্যের টানে প্রবেশ করিলাম যেনো এক অজানা রাজ্যে। সেখানকার পরিবেশ এতটা নীরব, এতোটাই নীরব যে একটি সূচ পড়ার শব্দও শোনা যাইবে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছিলো। চারিদিকে কুয়াশা নেমে পড়িয়াছিলো। এ যেনো সত্যিই অন্য একটি জগৎ। কিছুক্ষন হাঁটার পরে, আমি যাহা দেখিলাম তাহা কখনও লিখিয়া প্রকাশ করিতে পারিবো না। ইহা আশ্চর্যজনক হইলেও বাস্তব। একটি পরী অন্ধকার একটি কুটির থেকে বের হইয়া আমার দিকে আসছিলো। আমি একটা মুহুর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। এতো সুন্দর মেয়ে পৃথিবীতে সত্যিই বিদ্যমান। চাঁদর গায়ে বালিকার নজরকারা চোখ, মায়াবী চেহারা। সত্যিই আমি হতভাগ। তখন আমি নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করিতে পেরেছিলাম না।


এই ঘটনার পর অনেকদিন হাঁটতে যাওয়া হয়ে উঠেছিলো না। একদিন সকালে অজানা মেয়েটির নামটা জানতে পারি। ভিনদেশী কন্যাটির নাম জেনে আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম। মনের মধ্যে অন্যরকম একটা আনন্দ উপভোগ করতে ছিলাম।


মেয়েটিকে আমি চিনি কিন্তু দেখিনি
তাকে নিয়ে এখনও খুব বেশী ভাবিনি;
মনে হয় খোলা চুলে অপরূপা হবে,
মুক্তা ঝরা হাসিতে অন্যকে জয় করবে।
ভাবনা গুলো ফিরে ফিরে আসে
যদি একটু বসতো এসে পাশে;
যদি হাত বোলাত আমার ঝাঁকড়া চুলে
একটু না হয় রেগেই যেতো,
লুকিয়ে আদর দিলে।

আমি না হয়, মেনেই নিতাম
অপেক্ষা এখন না পাই,
একদিনতো পাব যত ইচ্ছা
না হয় কিছু আবদার করতো,
নাকটা তার ফুলিয়ে
আমি তো দিতেই চাই,
একূল ওকুল ভাসিয়ে।
মেয়েটি কি খুব ভাব

গম্ভীর নাকি আলাপি
সত্যিই সুখী, নাকি
সুখের আভায় গোলাপি;
চেনা হয়নি, কথা শুনে
মনে হয় পানি ঝর্না
শুধু তার নামটি জানি, সুবর্ন্যা।


আমি বুঝিতে পেরেছিলাম যে কন্যাটিকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্ত কি করার ছিলো? মেয়েটি তো অচেনা। সে কেনোই বা আমাকে ভালোবাসবে। তাই, নিজের ভালোবাসা নিজের কাছেই রাখিলাম। হঠাৎই এক সকালে ভিনদেশী কন্যার ফোন, কথা হয়েছিলো অনেকক্ষন। এরপর একদিন আলাপ হলো সামনা সামনি, অবশেষে থমকে যাওয়া সেই অচেনা পরীটা আমার সামনে আসিলো। দেখা হলো, পাশাপাশি অনেকটা পথ চলিলাম। অবশেষে বালিকার কোমল হাতদুটি ধরিলাম, বলিলাম ভালোবাসি তোমায়, হে কন্যা!

ভালোবাসর প্রহরে,
জড়িয়ে দিলাম নিজেকে।
এত কষ্টের মাঝে, আর নিজেকে
আটকে রাখতে পারলাম না।
ভালোবাসার আঙিনায়
নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম।
সেই অচেনা পরীটা, আর
আমাকে একা থাকতে দিলনা।
অচেনা পহরে চলে যাচ্ছি।
হৃদয়পুরের সেই মেয়ে,
তার সাথে হয়ে গেলো হটাত
দেখা,
থাকতে পারলাম না আর একা।


শুরু হয়ে গেলো আমাদের প্রেম। যে ছেলেটি একসময় কিছুই বুঝতো না, সে এখন প্রেম করে। সত্যিই বুঝি না প্রেম তুমি কি?


প্রেম তুমি অচেনা এক
মেয়ের চোখের কাজল।।
যে চোখে তাকলে এমন মনে হয়
যেন পৃথিবীর সব তাকে ঘিরেই।।
হালকা বাতাসে উড়া সেই
নীল ওড়না মনের মাঝে
অকারনেই নাড়া দেয়।
এই বুঝি মায়াবি সেই জলকন্যা
যার প্রতীক্ষা হয়তো
বহু বছর ধরেই ছিলো।

প্রেম তুমি তৃণ লতা ঘাসে নয়
তুমি বিচরন করো সেই
অচেনা মেয়ের চুলের ভাজে।
চুল তো নয় যেন বিশালতা
ভর করে আকাশে।
তার মিষ্টি হাসি মুখে
যেন অজানা এক সুখ ছিলো।
যে সুখে ডুব দিতে চায় না
এমন কোনো মানুষ পাওয়া দূর্সাধ্য।


বালিকার সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো বড়ই হাস্যকর। এই যুগে যা আপনারা বিশ্বাস করিবেন না। আমাদের যোগাযোগটা পত্রের মাধ্যমে হতো।  যেটাকে হয়তো সাহিত্যের ভাষায় প্রেমপত্র বলে।


শৈশব আর কৈশোর করে অতিক্রম,
মনাকাশে আগমন শত মতিভ্রম;
এই সেই খ্যাতনামা যৌবন যাপন,
প্রেমাবেগ ক্ষণে ক্ষণে হয় যে আপন।
মানব-মানবী করে টান অনুভব,
বিপরীত মনুগণে প্রেম বুঝি সব;
ভালবাসা-ভালোলাগা ক্ষণে আসে,
হৃদয়ে প্রিয়ার ছবি প্রতিক্ষণে ভাসে।

এমনি সম্পর্কে বাঁধা পড়ে যাবে যবে-
মনে মনে সুপ্ত কবি পদ্য লিখে যাবে;
কাছে পেয়ে প্রিয়জন বল যত কথা,
থেকে যাবে বেশী বাকী পাবে মনে ব্যাথা।
যতবার দেখা হবে বল সব কথা,
তারপর অবশেষ কত আত্মগাঁথা;
তাইতো প্রিয়ার প্রতি গভীর নিশীথে,
খাতা-পেন নিয়ে হাতে গ্রীষ্ম কিংবা শীতে।

মনের হাজার কথা অব্যক্ত সে ভাষা,
কাগজ-পাতায় জমে মনে আনে আশা;
হাজারো মানেতে আর অভিমানে ভরা,
লেখনীর প্রতি ছত্রে সুখ-দুঃখ সারা।
এমনি লেখায় ভরা কাগজের পাতা,
ভালবাসার জীবন্ত দলিলের খাতা;
হাজার বছর ধরে এই সেই পত্র-
প্রেমিক-প্রেমিকা গাঁথা খ্যাত প্রেমপত্র।


শীতের শেষের দিকে, কুয়াশাচ্ছন্ন এক ভোরে বালিকার সাথে প্রাতভ্রমনে গিয়েছিলাম। সেদিন সত্যিই অনেক আনন্দ হয়েছিলো। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন ছিলো সেটা। সেদিনই প্রথম কোনো মেয়ের হাত ধরে হেটেছিলাম আমি। সুবন্যাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিলো।


তারায় তারায় রটিয়ে দেব
তোমার আমার প্রেমের আখ্যান ,
পুস্পে পুস্পে গাঁথব মালবিকা
নমশূদ্রের প্রেম লীলা।
প্রেম করেছি, ভয় কি তাতে ,
লুকাবো কেন আড়ালে।

তোমার আমার প্রেমের কথা
জানবে জানুক সারা দুনিয়া ।
তোমাতেই বিলীন আমি
স্বর্গসুখের ঘেরাজালে ,
বাসবো ভালো শুধুই তোমায় ,
মনে রেখো প্রিয়তম।


সুবন্যাকে আমি পেয়ে সত্যিই নিজেকে ধন্য মনে করি। আমার জীবন সার্থক তার ভালোবাসায় সিক্ত হতে পেরে।


দেখেছি তোমায় কন্যা
দেখে মনে হল তুমি অনন্যা
তোমার চুলে মেঘের বন্যা
চোখে দেখি লেখা আছে করুণা।

সেই চোখেতেই চোখ রাখি
উড়াই কত স্বপ্ন পাখী
বেধেছি যে প্রেমের রাখী
ঝুলছি ঝুলন সখা-সখী।

এমনি করে দিন কি যাবে?
কি এসে যায় কে কী ভাবে?
দুজনেতেই চলবো ভেসে
খরা কিংবা বন্যা
কারন তুমি অনন্যা।
হে প্রিয়তম সুবন্যা।


এভাবেই চলছে জীবন। জানি চলে যাবে এভাবেই। এ হৃদয় আজ বড়ই সুখী। আর সেই সুখের একমাত্র কারন ভিনদেশী কন্যা, সুবন্যা।

Comments

Popular posts from this blog

চলো---স্বপ্ন দেখি

পুতুলের বিয়ে

বুড়ি