অনন্যাদের জীবন
মোঃ শহীদ হোসেন হৃদয়ঃ-
বাসটা টার্মিনালে পৌঁছানোর ঠিক কিছুক্ষণ আগেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। অসময়ে বৃষ্টি সঙ্গে ছাতাও নেই। সঙ্গে ছাতা নেবার মানুষ আমি না। ব্যাগটা মাথার উপর দিয়ে মাথা বাঁচিয়ে কোনো ভাবে বাস টার্মিনালে ঢুকবো, সাথে সাথে দেবদূতের মত এক রিক্সা এসে হাজির। কাটায়খানা যাবে? যাবো ৩০টাকা লাগবে। আমিও কোনো কথা না পেঁচিয়ে সোজা উঠে পরলাম। আমি অবশ্য রিক্সাওয়ালাদের সাথে কৌতুক না করে উঠি না। এবার বৃষ্টি নিয়ম বদলালো।
একবার কি হলো আমি মজমপুর থেকে সরকারি কলেজ এ যাবো বেশকিছু রিক্সা আমায় ডেকে বলে কই যাবেন মামা। আমিও ঠিকানা বলি ভাড়া জিজ্ঞাস করি। কেউ বলে ৩০টাকা, কেউ চাইলো ২৫টাকা, কেউ বলে ২০টাকা। আমি ২০টাকার জনকে নিয়ে গন্তব্যে পৌছাই। আর তাকে সর্বোচ্চ ভাড়াটা ৩০টাকা দেই। এতে সে খুশি হয়ে মনখোলা দোয়া করে দেয়।
বড় আন্টির বাড়িতে বিশেষ কারণে নিমন্ত্রণ। দুই ছেলে তার। নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। শহরের বাহিরে থাকে। আঙ্কেল হাঁপানী রুগী। সামান্য ঠান্ডায় হাসপাতালে ছুটতে হয়। অতএব পাহারা দেবে কে? বাড়ির ব্যাচেলর ছেলে। তাই পাহারাদারি আমাকেই করতে হবে।
বাসে ১ ঘন্টার পথ। রাস্তা প্রচন্ড ভাঙার কারনে ২ ঘন্টা লাগলো। পৌঁছাতে প্রায় ২টা বেজে গেলো। রিক্সা গন্তব্যে, আন্টি বারান্দায় পায়চারি করছে। আয় আয় মুখখানা শুকিয়ে কাট হয়ে গেছে। গামছা রাখা আছে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বোস তো।
প্রায় গলা অব্ধি খেয়ে নড়তে পারছি না। রাতে খাবো কি করে। আঙ্কেলকে দেখে এসেই রিমোট হাতে বিছনায় মিলে গেলাম।
পরদিন ভোরে বারান্দায় বসে আন্টির সাথে চা খেতে খেতে গল্প করছি হটাৎ দেখি চেনা অচেনা এক মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আন্টি দেখেই বলে উঠল..
- এই অনন্যা কই যাচ্ছিস? আজ তো কলেজ নেই, টিউশনি করাতে?
- না গো খালা বাজার করতে।
আন্টি কে মেয়েটা? প্রশ্ন করে বসলাম।
শরিফুল্লাহ সাহেবের মেয়ে অনন্যা, তুই ছোট বেলায় দেখেছিস। বাপটা ক্যান্সারে মারা যায়। যা ছিলো সবটাই বাপের অসুখে শেষ করছে। কি করে ওদের চলে, কি খায় কে জানে। টিউশনি করে কয় টাকাই আর পায়।
আন্টি রান্না ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন। মনটা ভার হয়ে রইল। পরদিন বাজারের রাস্তায় আবার দেখা। কেনো জানিনা কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
- কেমন আছেন?
- ভালো
- কই যান?
- কলেজে
- আমি হৃদয়
- জানি, মা বলেছে; আচ্ছা ভালো থাকবেন, আমি আসছি।
অদ্ভুত কাণ্ড ছোট জায়গায় সব খবর দ্রুত ছড়িয়ে যায়।
হটাৎ মেয়েটাকে ভালো লাগতে শুরু করলো। এক্ষুনি বিয়ে না করার ইচ্ছেটা মাটিচাপা দিতে হবে। আমার জন্য একটা পরিবার ভালো থাকলে ক্ষতি কই। মনের গম্ভীর ভাবটা কেটে ফুরফুরে হয়ে গেছে।
বিকেলে গল্পের ছলে আন্টির থেকে আরো তথ্য পাওয়া গেলো। বড় বাজারের কাছেই অনন্যার কলেজ। ৯ টায় কলেজে যায় টিউশনি সেরে ৬ টায় বাড়ি ফেরে।
পরদিন সকালে পাড়ার মোড়ে অপেক্ষারত। আর মাথায় নানান প্লান। মুখোমুখি কথা বলতেই হবে। আর বাড়ি ফিরে মাকে জানাতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে সে আসছে। ভোরের স্নিগ্ধতায় তাকে বেশ পবিত্র ও মায়াবী লাগছে।
- সু-প্রভাত।
- আপনি,কোথায় যান এই ভোরবেলা?
এবার অপ্রস্তুত ভাবে বলে ফেললাম - এই একটু ঘুরতে বের হলাম।
অসস্তি কাটিয়ে ফের প্রশ্ন করলাম, ফিরবেন কখন?
- কেন?
বলেই মেয়েটা রিক্সায় উঠে রওনা দিলো।মেয়েটার গায়ে না পরা ভাবটা আমায় মুগ্ধ করলো।
দুপুরে খেয়ে আর ঘুমালাম না। সোজা বেরিয়ে পরলাম বড় বাজার, অনন্যার কলেজের সামনে যাবার উদ্দেশ্যে। ফেরার সময় একসঙ্গে ফিরবো। কথাটা বলতেই হবে।
- ভাই কলেজটা কোনদিকে?
- এই পথ দিয়ে বাজারের মধ্যে ডান দিকে। এই সোজা পথেও যেতে পারেন ঘুরপথ হবে। বাজারের পথে হাটতে শুরু করলাম। দোকানপাট কিছু খোলা কিছু বন্ধ। এখন ঠিক অনন্যার কলেজের পাশে অপেক্ষা করছি। সময় কাটাই কি করে??
চায়ের দোকানে বসে সিগারেট ধরিয়ে দোকানীর সাথে বকবক করে সময় কাটাতে চাইছিলাম। হটাৎ রাস্তার ওপারে তাকিয়ে দেখি দোতলা বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে। আমি সিগারেটের বিল মিটিয়ে। তার কাছে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াই। এর মধ্যে বাইক থেকে নেমে মেয়েটাকে কি যেনো বললো আর মেয়েটিও তার সাথে দোতলা ভবনে একটি কক্ষে ঢুকে গেলো।
বুকের ভিতরটায় চিনচিন ব্যথা অনুভব করলাম। হনহন করে চলতে শুরু করলাম। কিছু দূরে গিয়ে মন ঠিক শাই দিচ্ছেনা ফের দাঁড়িয়ে পড়লাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম বিপরীত দিকের চায়ের দোকানে। প্রায় ১ ঘন্টা পর সে বেড় হলো।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার কাছে গিয়ে তাকে ডাকলাম
- এই শোনো! ভেতরে তখনো সুনামি বইছিলো।
- ওহ, আপনি? (প্রতিবাদী না শান্ত ভঙ্গিতে বলছিল।)
তবুও মাথা গরম হয়ে গেলো। নিজের অধিকারের বাহিরে চলে গেলাম।
- কলেজের নামে বয়ফ্রেন্ডের সাথে নোংরামি।
- কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ; আপনি সব জেনে গেলেন।
জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনে কতগুলা ১০০ টাকার নোট। পার্সে রাখতে রাখতে বললো দেড় ঘন্টা ছিঁড়ে খেয়ে ১০০০ টাকা দিলো। মায়ের হার্টের ঔষধ লাগবে ৪০০ টাকার বাকি টাকায় কয়েকদিন চলা যাবে।
কি করবো? মাকে তো বাঁচাতে হবে, বলেই হাঁটে যাচ্ছে অনন্যা।
[গল্পটির চরিত্র, স্থান, সময় সব কাল্পনিক। তবুও, বাস্তবতার সাথে অনেকটা মিল আছে। এটাই অনন্যাদের বাস্তবতা। এর জন্য দায়ী কারা বলতে পারেন?]

Comments
Post a Comment